খাদেমকে হত্যার আগেই ঠিক করে রাখা হয় কবর’

হারানো’ পদ ফিরে পেতে মসজিদের প্রধান খাদেম আবু হানিফ শেখকে হত্যা করে মসজিদের বারান্দায় রেখেছিলেন আরেক খাদেম সাইফুল। পরিকল্পনা ছিল হত্যার পর লাশ আজিমপুর কবরস্থানের একটি পরিত্যক্ত কবরে রাখার। সেজন্য আগে থেকে কবরও ঠিক করে রাখা হয়। কিন্তু মানুষের আনাগোনা থাকায় মসজিদ থেকে লাশ সরাতে ব্যর্থ হন। পরে বাবা মারা গেছে জানিয়ে মসজিদ থেকে সটকে পড়েন খাদেম সাইফুল।

গ্রেপ্তারের পর আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে এমন চাঞ্চল্যকর তথ্য দেন আজিমপুরের মেয়র মোহাম্মদ হানিফ মসজিদের খাদেম সাইফুল। মসজিদটির প্রধান খাদেম হানিফ শেখকে হত্যার দায়ে যাকে গতকাল সোমবার চট্টগ্রাম থেকে গ্রেপ্তার করেছিল পুলিশ।

মঙ্গলবার ধানমন্ডিতে সংবাদ সম্মেলন করে খাদেম হানিফ শেখকে হত্যার তথ্য সাংবাদিকদের সামনে তুলে ধরেন পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেসটিগেশনের (পিবিআই) প্রধান ডিআইজি বনজ কুমার মজুমদার। এ সময় গণমাধ্যমের সামনে হাজির করা হয় মামলাটির একমাত্র আসামি সাইফুলকে।

পিবিআই প্রধান বলেন, ‘সাইফুল একসময় মেয়র হানিফ মসজিদের প্রধান খাদেম ছিল। দীর্ঘদিন এখানে কাজ করলেও কাজের প্রতি আগ্রহ কম ছিল। আরেক খাদেম আবু হানিফ মসজিদে যোগদানের পর কর্তৃপক্ষের কাছে জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন। পরে সহকারী খাদেম হানিফ শেখকে প্রধান খাদেম বানায় কর্তৃপক্ষ। পদ হারিয়ে হানিফের ওপর বিরক্ত ছিল সাইফুল। মাঝে মাঝে হানিফকে বকাঝকাও করত। পদ ফিরে পেতে হানিফ শেখকে মেরে ফেলার পরিকল্পনা করে।’

বনজ কুমার বলেন, পরিকল্পনা অনুযায়ী বাজার থেকে একটি ছুরি কিনে এনে রান্না ঘরে রাখে সাইফুল। ২ জুলাই দুপুরে হানিফ শেখ যখন মসজিদের দ্বিতীয় তলায় ঘুমিয়েছিলেন, তখন উপর্যুপরি ছুরিকাঘাত করে তাকে হত্যা করে সাইফুল। নিহত হানিফের শরীরে এগারোটি ছুরির আঘাত পাওয়া গেছে। পরে মরদেহের মাথা ও পা এক সঙ্গে বেঁধে বস্তায় ভরে মসজিদের ব্যালকনির ঝুঁড়িতে রাখা হয়। হত্যার পর বাথরুম থেকে পানি এনে তোষকের কাভার দিয়ে মসজিদের মেঝেতে থাকা রক্ত পরিষ্কার করেন।’

হত্যার পর সাইফুল মসজিদেই বিশ্রাম নেয় বলে জানান পিবিআই প্রধান। বলেন, ‘হত্যার পর বিশ্রাম শেষে আসরে নামাজ পড়তে যায় সাইফুল। নামাজ শেষে হত্যার সময় জামাকাপড়ে লাগা রক্ত ধুয়ে দেন। রাত নয়টার দিকে একটি বাসায় খেতে গিয়ে সেখান থেকে আরেকটি বস্তা আনেন। তবে মসজিদে লোকজনের আনাগোনা থাকায় তখন বস্তায় লাশ ভরাতে পারেনি।’

‘সাইফুলের উদ্দেশ্যে ছিল, সবাই ঘুমিয়ে পড়লে হানিফের লাশ আজিমপুর করবস্থানে একটি পরিত্যক্ত কবরে ফেলে দিবে। হত্যা করার পরিকল্পনার আগে আজিমপুরে একটি ভাঙা কবর দেখেও রেখেছিল সে। সাইফুলের ধারণা ছিল ওই কবরস্থানে লাশ ফেললে কেউ আর খুঁজতে যাবে না। তবে অন্য খাদেমরা জেগে থাকায় তার পরিকল্পনা ভেস্তে যায়। ২ জুলাই দিবাগত রাতে বাবা মারা গেছে জানিয়ে মসজিদ থেকে বেরিয়ে যায়।’

ডিআইজি বনজ কুমার বলেন, মসজিদ থেকে বের হওয়ার পর শ্বশুরবাড়িতে যায় সাইফুল। বিভিন্ন মিডিয়ায় খবর প্রকাশ হলে স্ত্রীর সঙ্গে দেখা করে নিজের আত্মীয়দের বাড়িতে আশ্রয় নেয়। সেখান থেকে ফুফুর বাড়ি চট্টগ্রামের আগ্রাবাদে যায়। সেখান থেকে পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করে।

পিবিআই প্রধান বলেন, ‘৩ জুলাই রাজধানীর আজিমপুরে খাদেম খুন হয়। বিষয়টি জঙ্গি কানেকশন নিয়ে প্রথমে তদন্ত করা হয়। পরে দুইজন সহকারী খাদেম ও একজন সুইপারকে আটক করা হয়। পরে সাইফুলকে গ্রেপ্তারের পর আসল রহস্য উদঘাটন করা সম্ভব হয়। এই ঘটনায় সেই একমাত্র আসামি।’

গত ৩ জুলাই রাত সাড়ে ১২টার মসজিদ থেকে হানিফের বস্তাবন্দি লাশ উদ্ধার করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। নিহত আবু হানিফের বাড়ি গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *